মানুষের জন্ম শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, জানার জন্যও। মানুষের চোখে যখন প্রথম কালো মেঘে ঢাকা ভয়ঙ্কর আকাশ ভেসে উঠেছিল, তখন বজ্রপাতের গর্জন শুনে তার মনে ভয় জেগেছিল। ভয় থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বাস, আর বিশ্বাস থেকেই নানামুখী এই ৪০০০ এর অধিক ধর্মের সূত্রপাত। মানুষ অজানাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঈশ্বর, দেবতা, ফেরেশতা বা পরজগতের কথা ভেবেছিল। এই চিন্তা যুগে যুগে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে, আবার অনেক সময় বেঁধেও রেখেছে। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কে যে প্রশ্ন করার অদম্য শক্তি আছে, সেটিই একদিন তাকে এই প্রশ্নে পৌঁছে দিল যে “সব কিছু কি সত্যিই কোনো অদৃশ্য সত্তা নিয়ন্ত্রণ করে?”
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নাস্তিকতার, অর্থাৎ এমন এক ভাবনার, যা বিশ্বাস নয়, যুক্তির ওপর দাঁড়াতে চায় ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “নাস্তিক” শব্দটি অনেকের কাছে গালি হয়ে গেছে, অথচ এর মূল অর্থ একেবারে নিরপেক্ষ। নাস্তিক মানে “না + আস্তিক” অর্থাৎ যে আস্তিক না বা যে কোন সুপার ন্যাচারাল ঈশ্বরে ‘আস্থা’ রাখে না। নাস্তিকতা কোনো ধর্ম-বিরোধী মতবাদ নয়; এটি কেবল বিশ্বাসের পরিবর্তে প্রমাণ ও যুক্তির ওপর নির্ভর করার জীবনদর্শন।
নাস্তিকতা বলে— “যে বিষয়ে প্রমাণ নেই, সে বিষয়ে বিশ্বাসের দাবি করা অনুচিত।” এখানে কেউ ঈশ্বরকে অস্বীকার করছে না; বরং বলছে ‘প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমি নিরপেক্ষ থাকব।’ যেমন, যদি কেউ বলে, “এই ঘরে এক অদৃশ্য পরী আছে”, তাহলে সেই কথায় বিশ্বাস করার আগে আমরা জানতে চাইব কোথায় প্রমাণ? ঠিক সেই রকমভাবেই নাস্তিক মানুষ প্রশ্ন করে, “ঈশ্বর আছেন এর প্রমাণ কোথায়?”
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে চার্বাক নামের এক দার্শনিক দল ছিল, যারা বলত “যা দেখা যায়, তা-ই সত্য। তাদের মতে, “ঈশ্বর” ধারণা মানুষের ভয় ও কল্পনার ফল।
পাশ্চাত্যে গ্রীক দার্শনিক এপিকিউরাস প্রশ্ন করেছিলেন –
“যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হন, তবে তিনি দুঃখ কেন দূর করেন না?
যদি পারেন না, তবে তিনি সর্বশক্তিমান নন;
যদি পারেন কিন্তু চান না, তবে তিনি দয়ালু নন।”
এই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। পৃথিবীতে যখন নিষ্পাপ নিরীহ শিশুর মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে তখন একজন নাস্তিক জিজ্ঞেস করে, “একজন সর্বশক্তিমান, পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহাজ্ঞানী পরাক্রমশালী ঈশ্বর থাকলে এসব ঘটে কেন?”
বিজ্ঞানের যুগে এসে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হতে থাকে। গ্যালিলিও, ডারউইন, নিউটন, আইনস্টাইন এরা সবাই দেখিয়েছেন যে প্রকৃতির নিয়ম নিজেরাই কাজ করে; কোনো অলৌকিক হস্তক্ষেপের দরকার নেই। বজ্রপাত, বৃষ্টি, এমনকি মানুষের বিবর্তন এই সবই বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
তাহলে, অজানাকে বোঝাতে ঈশ্বরের ধারণা কি আজও প্রয়োজনীয়? এই প্রশ্নটাই নাস্তিকতার জন্ম দেয়।
ধরা যাক, কেউ অসুস্থ হলে প্রার্থনা করে, “আল্লাহ আমাকে সুস্থ করুন।” কিন্তু সে-ই আবার চিকিৎসকের কাছে যায়, ওষুধ খায়, অস্ত্রোপচার করায়। তাহলে সে জানে কাজটি আসলে করে মানুষই, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে।
নাস্তিকতা এখানেই বলে “মানুষের শক্তিই প্রকৃত শক্তি। নিজের প্রতি বিশ্বাসই আসল বিশ্বাস।”
নাস্তিকরা ঈশ্বরে নয়, মানবতায় আস্থা রাখে। তারা বলে “আমি ভালো কাজ করব কারণ সেটি মানুষের উপকারে আসে, ঈশ্বরের ভয় নয়, বিবেকের তাগিদে। অর্থাৎ নৈতিকতা এখানে ধর্মনির্ভর নয়, মানবিক বোধনির্ভর।
বাংলাদেশ একটি গভীর ধর্মবিশ্বাসী মানুষের দেশ, এখানের সবাই জেনে ধর্মে বিশ্বাস করে না, অধিকাংশ মানুষই বংশ পরম্পরায় ধার্মিক এবং পরিবার ও তার সমাজ থেকে পাওয়া রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে ধর্মে বিশ্বাস করে। এদেশের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি (অফিসিয়াল জরিপ, যদিও এখন বহু মোসলমান তলে তলে নাস্তিক) মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, এবং এদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে নাস্তিকতা উচ্চারণ করা মানেই যেন জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের তরুণ সমাজের একাংশ আজ প্রশ্ন করছে। তারা ধর্মকে ঘৃণা করছে না, বরং জানতে চায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? কী প্রমাণ আছে?
ইন্টারনেট ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে মানুষ যুক্তির আলোয় বিষয়গুলো দেখতে শিখছে।
তবুও, অনেকেই এখনও মনে করেন— “নাস্তিক মানেই ইসলামবিদ্বেষী।” এটি ভুল ধারণা। নাস্তিকতা কোনো ধর্মবিরোধী রাজনীতি নয়; এটি চিন্তার স্বাধীনতা। একজন নাস্তিকও নৈতিক, দেশপ্রেমিক, পরোপকারী হতে পারেন এমনকি একজন ধর্মান্ধের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক হতে পারেন। একইভাবে অপরাধীও হতে পারেন, বস্তুত একজন মানুষ কতটা ভালো বা খারাপ তা অস্তিকতা বা নাস্তিকতার উপরে বর্তায় না বর্তায় তার অবস্থান, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত মোটিভ এর উপর ।
বাংলাদেশে যারা মুক্তচিন্তার আন্দোলন করেছেন যেমন আরজ আলী মাতুব্বর, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায় তাঁরা দেখিয়েছেন, চিন্তার স্বাধীনতাই সমাজের উন্নতির মূল। তাঁদের ওপর আক্রমণ হয়েছিল এই কারণেই যে, তাঁরা অন্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছিলেন। যা ধর্ম বেঁচে খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ও ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে শোষণ করা শ্রেণির মনে আতঙ্ক তৈরি করেছি। কিন্তু সত্য প্রশ্নে ভীত হয় না প্রশ্নেই সত্য আরও স্পষ্ট হয়।
নাস্তিকতা আসলে ভয়হীন জীবনের নাম যা মানুষ আর অদৃশ্য শক্তির করুণার ওপর নির্ভর করে না; বরং নিজের পরিশ্রম, মেধা , জ্ঞান আর মানবিক আচরণের উপর আস্থা রাখে। প্রকৃত নাস্তিকতা কোন ধর্মকে গালি দেওয়ার সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না; বরং বলে যে “বিশ্বাস রাখো, তবে প্রশ্ন করতে শেখো।” প্রকৃতি তার নিয়মে চলে তুমি নামাজ পড়ো বা না পড়ো, সূর্য উঠবেই, নদী বইবেই, বৃষ্টি হবেই, তাহলে কেন আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করি? যেহেতু আপনার আমার বিশ্বাসের ঈশ্বর প্রতিদিনই আপনার আমার ধর্মের বাহিরে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সমাজে, পরিবারে নতুন নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছেন, সেহেতু ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ এসব পেরিয়ে মানুষ যদি মানুষকে ভালোবাসে, তবেই পৃথিবী সুন্দর হবে। নাস্তিকতা এমনই এক ইনক্লুসিভ মতবাদ ও বেদাবেদ ভুলে সকলকে সমান ভাবে ভালোবাসার যুক্তিনির্ভর সংস্কৃতি— যেখানে শুদু মন্দির, মসজিদ, গির্জা নয়, মানুষের হৃদয়ই শ্রেষ্ঠ উপাসনালয়। যেখানে প্রার্থনা মানে— “হে মানুষ, তোর মনুষ্যত্ব যেন কখনও না মরে।”
নাস্তিকতা কোনো যুদ্ধ নয়; প্রচার করার বিষয়ও নয়, প্রকৃতিগতভাবে মানুষ মাত্রই নাস্তিক, একজন মানুষ যখন পৃথিবীতে জন্ম নয় তখন সে মাতৃগর্ভ থেকে কোন ধর্মের অনুশীলন করে জন্ম নেয় না, সে একদম শূন্য মেমোরি ও শূন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে, এবং তারপর সে তার পরিবার এবং সমাজের প্রেক্ষাপটে কোন নির্দৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠে কিংবা কোন নাস্তিক পরিবারে জন্মালে সে কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেরই অনুসারী হয়ে উঠে না ।
নাস্তিকতা একটি অন্ধবিশ্বাসী সমাজে এক আলোর শিখা, যা অন্ধকারে যুক্তির প্রদীপ জ্বালায়। যারা অন্ধ বিশ্বাসে চোখ বুঁজে থাকে, তাদের চোখ খুলে দেখার সাহস দেয়। ধর্ম যদি মানুষকে ভালো হতে শেখায়, নাস্তিকতা তাকে চিন্তা করতে শেখায়। এই দুই মিলেই গড়ে উঠতে পারে মানবতা, যেখানে ঈশ্বরের চেয়ে বড় হয় মানুষ নিজেই।

