জাতি হিসেবে আমরা কিছুটা চিন্তাগ্রস্থ হলেও এখনো যথেষ্ট চিন্তাশীল নই আমরা। আমরা একটু চিন্তায় পরে গেলেই হাপিয়ে যায়, আমাদের কাছে নিয়মিত চিন্তা ভাবনা চর্চা যেন নিয়ম করে বিষের পাত্রে চুমুক, যেটা মোটেও কাম্য নয়, চিন্তাচর্চা ব্যতিরেকে কোনো জাতি কখনোই সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে পারে না। চিন্তাশীলতা বিস্তারের জন্য মুক্তচিন্তা তার পূর্বশর্ত। মুক্তবুদ্ধির চর্চা যে সমাজে নেই, সেই সমাজ স্থবির হতে বাধ্য। গুহার জীবন থেকে শুরু করে এই আধুনিক সভ্যতা সবই সম্ভব হয়েছে মুক্ত চিন্তার চর্চার মাধ্যমে। পৃথিবীর প্রাচীনকাল থেকে যখন মানুষের শাসন এবং সমাজ ব্যবস্থার শুরু হয়েছে তখন থেকেই মুক্তবুদ্ধির চর্চা শুরু হয়েছে। পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্য সব পরিবর্তিত সমাজ ব্যাবস্থায় এর প্রভাব রয়েছে, এটি এমন নয় য মুক্তচিন্তার ধারাটি আমরা শুধু পাশ্চাত্য থেকে গ্রহণ করেছি। বরং আমাদের এই প্রাচ্যেও মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে।
মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের চেতনা। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তবুদ্ধি চর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার কোন বিকল্প নেই। প্রকৃত গনতন্ত্রের পূর্ব শর্ত সেখানে মুক্ত বুদ্ধি চর্চার পরিবেশ থাকা, নয়ত যেই গনতন্ত্র আমরা পাবো সেটা অপূর্ণাঙ্গ গনতন্ত্র বলেই বিবেচিত হবে। যেমন একটি দেশের সকল মানুষ যদি তার শিক্ষা ব্যাবস্থা বা মতবাদ থেকে ভুল সরকার নির্বাচনের শিক্ষা পায়, তাহলে সেদেশের সুস্থ ভোটের নির্বাচনও একটি ভুল সরকারকেই প্রতিবার নির্বাচিত করবে।যেহেতু তারা মুক্তচিন্তার অভাবে সঠিক টা বুঝে উঠতে পারে নি। অতএব, মুক্তচিন্তা আর প্রত্যেকের নিজস্ব মতবাদ প্রকাশের বাক স্বাধীনতা প্রকৃত গনতন্ত্রের পূর্বশর্ত। প্রকৃত গনতন্ত্রের পরিবেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে মুক্ত বুদ্ধি চর্চার সাথে পাল্টা পালটি যুক্তির বিতর্ক। প্রকৃত গনতন্ত্র ও মানুষের মুক্তির রাজনীতির জন্যে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ সত্য জানার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে বিতর্ক চর্চার পরিবেশ এবং গনমাধ্যমে মুক্ত বিতর্কের ভূমিকাও অপরিসীম।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৯ তে প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলো থেকে বিতর্কের প্রাতিষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ওই সময় সোফিস্ট নামে পেশাদার বিতার্কিক শ্রেণী গড়ে ওঠে। প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও জাতীয় নীতিনির্ধারক বিষয়ে জনগণের মতামত গ্রহণ করা হতো। রাষ্ট্রের সভা-সদস্যরা তাদের মতামত তুলে ধরতেন; বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন। এভাবেই এথেন্সে বিতর্ক একটি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করে। এক্ষেত্রে সোফিস্টরা যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময়ে প্রত্যেক ছাত্রকে অস্ত্রবিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাসবিদ্যার পাশাপাশি বিতর্ক শাস্ত্রে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে হতো। যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের যুক্তিকে দুর্বল করে নিজের মতকে জোরালো ভাবে উপস্থাপনার প্রচলিত ধারাটি প্রথম সক্রেটিসের বক্তব্যের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। তার শিক্ষাদানের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। তিনি পথেঘাটে যেখানে-সেখানে সাধারণ জনগণের সঙ্গে দর্শন আলোচনা ও বিতর্কে লিপ্ত হতেন। তিনি বিপরীত পক্ষের জন্য তর্কের ফাঁদ পাততেন এবং পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতেন। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মতপ্রকাশের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো। তাকে মুক্তি দেয়ার একটি শর্ত ছিল বিতর্কের অভ্যাস ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু তিনি তা মানেননি। তিনি মৃত্যুকেই গ্রহণ করেছিলেন। তবুও যুক্তিযুক্ত বিতর্ক এবং সততার আদর্শকে বলি দেননি। এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সক্রেটিসই প্রথম মুক্তচিন্তার জন্য জীবন দিয়েছিলেন বলে স্বীকৃত ।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে যুক্তিবিদ্যার জনক বলা হয়। অ্যারিস্টটল প্রথম বিতর্কে যুক্তিবিদ্যার অবতারণা করেন। তিনিই প্রথম যুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রদান করেন এবং তা বিতর্কে প্রয়োগ করেন। দীর্ঘ দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যারিস্টটলের লজিক, মানুষের চিন্তার জগতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩ এ রোমের বিখ্যাত ঋষি ও দার্শনিক সিসেরো সেখানে বিতর্কের সূচনা করেন, রোমের সমাজেও বিতর্কের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তিনি মনে করতেন সমাজকে কলুষতামুক্ত করতে হলে বিতর্কের প্রয়োজন। ক্লাশরুম ও আদালতে প্রস্তাবের পক্ষে ও বিপক্ষে যে কোনো পাশে কথা বলার এবং নিজস্ব মত প্রদানের পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস যেমন বলেছিলেন ‘নিজেকে জানো’ তেমনি সিসেরো পরামর্শ দিয়েছিলেন সমাজের সঙ্গে বিতর্ক করার আগে নিজের সঙ্গে বিতর্ক করার জন্য।
আধুনিক সময়ে বিতর্কের যে প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র আমরা দেখতে পাই তা মূলত ইউরোপের আঠারো শতকের নবজাগরণের সময় হয়েছিল। এ সময়ে লন্ডনে ডিবেটিং সোসাইটি গড়ে ওঠে এবং খুব দ্রুত এটি জাতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। সমাজ সংস্কৃতি, রাষ্ট্রনীতি, বিচার, প্রেম-ভালোবাসা সব ক্ষেত্রে বিতর্ক শিল্প একটি স্থান দখল করে নিতে শুরু করে। বাংলাদেশে বিতর্কের সূচনা খুব বেশি পুরনো নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আশির দশকের প্রারম্ভে বিতর্কের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে বিতর্ক একটি সংঘবদ্ধ রুপ লাভ করেছে। আমাদের দেশে বিতর্ককে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশের কিছু ফেইসবুক গ্রুপ, টক শো পেজ এবং বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন। বিভিন্ন প্রজন্মের বিতার্কিকগণ এইসবে বিতর্ক করেন এনং এইসবে প্রদর্শিত বিতর্ক অনুষ্ঠান এবং লেখা লেখি দেখে কেও কেও পরিবর্তিত এবং অনুপ্রাণিতও হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ Norman Cousins বলেছিলেন, ‘The first purpose of education is to enable a person to speak clearly and confidently.’ স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারার সামর্থ্য অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য। আর এটা যদি শিক্ষার উদ্দেশ্য বলে অভিহিত করা হয় তবে এদেশে কতজন শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন তা আর বলার বাকি থাকে না। একাডেমিক ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। কিন্তু স্পষ্ট করে নিজেকে উপস্থাপন করার বৈশিষ্ট্য খুব বেশি মানুষের নেই। অথচ এটি হওয়া উচিত একজন মানুষের গুরুত্বপর্ণ যোগ্যতা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো স্তরেই শিক্ষার এই প্রাথমিক উদ্দেশ্য অর্জনের কোনো উপায় রাখা হয়নি। তাই বলে এ যোগ্যতা অর্জন অসম্ভব এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। মুক্তভাবে পড়ার এবং জানার ইচ্ছা থাকলে ও সম্ভব।
শিক্ষর উদ্দেশ্য অর্জনে সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ তর্ক করে এসেছে। নিজের কৃতকর্মের পক্ষে কারণ তুলে ধরা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি কখনও কোথাও কোন তর্ক করেননি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, সামাজিক ও রাজনৈতিক আচারে তর্কই সবচেয়ে দৃশ্যমান বস্তু। বাঙালি তর্কপ্রিয় জাতি বলেই সম্ভবত টেলিভিশনে টকশো এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এ তর্কের কথা আমি এই বইয়ে বলছি না, বলছি স্বাধীন ভাবে বিতর্কের কথা। যার এখনো যথেষ্ট অভাব আমাদের দেশে।
তর্ক নয়, বিতর্কই আমাদের লক্ষ্য। তর্কের সঙ্গে আবেগ, একগুঁয়েমি ও অন্ধবিশ্বাস জড়িত। কখনও কখনও পেশিশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে তর্কের পরিণতিতে। তর্ক আর কুতর্কে জড়িয়ে পড়ার অসংখ্য নজির রয়েছে আমাদের সমাজে। সেই অর্থহীন তর্কের সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। বিতর্ক শিল্প হিসেবে নবীন হলেও শিক্ষিত ও সচেতন সমাজের কাছে এ শিল্প যথেষ্ট সমাদৃত। বিতর্কে তর্ক থাকে, তবে সে তর্ক যুক্তিসিদ্ধ ও কার্যকারণ সংশ্লিষ্ট। বিতর্কে অন্ধ বিশ্বাস বা কুসংস্কারের কোনো ঠাঁই নেই।
বিতর্কে উত্তেজনা থাকে, সে উত্তেজনা হয় পরিশীলিত। শব্দের আক্রমণও থাকে, তবে সে আক্রমণ শিল্পিত। বিতর্কে দ্বন্দ্ব থাকলেও তা পরমতসহিষ্ণু ও উদার হতে শেখায়। সমাজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। শক্তিমান মতপার্থক্য একটি সমাজের প্রাণশক্তির পরিচায়ক। বিতর্কে এ মতপার্থক্য চিহ্নিত হয় যুক্তি দ্বারা। এটি অত্যন্ত আশার কথা যে এখন কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিতর্কের চর্চা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিতর্ক প্রতিযোগিতা এখন একটি সংঘবদ্ধ রুপও পেয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন নিয়ম জেনে ও মেনে এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন এবং সাফল্য অর্জন করেন সেটিই কাম্য। তবে প্রতিযোগিতার মঞ্চে জয়লাভই বিতার্কিকের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া ঠিক নয়, জীবনের মঞ্চেও জয়ী হওয়া চাই। সেই জয়ের পূর্বশর্ত প্রতিনিয়ত যুক্তির অনুশীলন। মননে ও ব্যক্তিত্বে যুক্তিবাদী হওয়াই বিতার্কিকের চূড়ান্ত অর্জন, জয়-পরাজয় নয়।
বিতর্কের জন্য বিতর্ক নয়, এমন এক সমাজ নির্মাণের জন্য কোন বিতার্কিক বিতর্ক করবেন যেখানে জোর নয়, যুক্তি বিজয়ী হয়। যেখানে জোরের যুক্তি নয়, যুক্তির জোর প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজকের এই সভ্য উন্নত ইউরোপ একসময় অন্ধকারে ছিল, এই সভ্য ইউরোপের এই রুপ এসেছে কারন এর আগে মানুষের মাঝে মুক্তচিন্তার গনজাগরণ এসেছিল। প্রচলিত নিয়মনীতি, ধর্মবিশ্বাসকে সেদিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এ জিজ্ঞাসার মূলে ছিল বিভিন্ন বিজ্ঞানী, দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসু রচনা সম্ভার। এ জাগরণের যে ফসল ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছিল তা রেনেসাঁ নামে পরিচিত। মুক্তবুদ্ধির জাদুবলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে গোটা ইউরোপের চিন্তাজগতে এবং পরে তা তাদের সরবস্তরের সমাজ কাঠামোতে।
রুশো, ভলতেয়ারের মতো চিন্তাবিদের রচনায় অনুপ্রাণিত হয় সেখানের ফরাসি বিপ্লব। যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল ইউরোপের রেনেসাঁ যা সেখানে মুক্তবুদ্ধির দ্বার উন্মোচন করেছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশে জাগরণ এসেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। সেই জাগরণ বা রেনেসাঁ ছিল খণ্ডিত। কারণ বৃহৎ মুসলিম সমাজকে সেই রেনেসাঁ স্পর্শ করেনি। মূলত হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ সাধিত হয়েছিল এ জাগরণে। ডিরোজিওর নেতৃত্বে একদল প্রগতিশীল ছাত্র প্রচলিত সংস্কার, রীতিনীতির প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ হয়ে উঠে নতুন চিন্তা ও দর্শনচর্চার ক্ষেত্র। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ প্রমুখ ছিলেন এ নবজাগরণের অগ্রদূত। তাদের সাবলীল বিতর্কে, তৎপরতায় শাণিত হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের চিন্তাধারা।
বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির প্রসারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। তখন ঢাকায় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ গড়ে ওঠে মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজলের মতো মুক্তচিন্তার বাহকরা ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাদের একটি মুখপত্র বের হত ‘শিখা’ নামে। এর প্রত্যেক সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা থাকত, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ (এটি খুব সম্ভবত আরজ আলী মাতুব্বরের উক্তি) এ অসাধারণ উক্তির ভেতর স্পষ্ট হয়ে যায় তাদের জীবনদর্শন। মুক্তবুদ্ধি, প্রগতি ও আধুনিকতার প্রতি তাদের নিষ্ঠা আজও আমাদের বিস্মিত করে। তাদের এই মুক্তবুদ্ধি প্রবন সমাজ ঘরার লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিতর্ক শিল্প। বিতর্ক আমাদের কিছু প্রশ্ন ও সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আমরা বিতর্কের কাছ থেকে পাই, তা হচ্ছে পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা। যার অনুসরনে এক অসহিষ্ণু মানসিকতা গড়ে উঠতে পারে যেকোনো সমাজে যেকোনো দেশে। ‘আমিই ঠিক, অন্য সবাই ভুল’- বা আমার মতাদর্শই একমাত্র সত্য বাকি সব ভুল। এই মানসিকতায় আক্রান্ত কমবেশি সবাই। একমাত্র পরমতের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে মুক্ত স্বাধীন বিতর্কই পারে আমাদেরকে এই ভ্রান্তধারণা থেকে মুক্তি দিতে। বিতর্কই নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ দেয়। তাই যেকোনো বিতর্ককে স্বাগতম জানানো যেতেই পারে।
সক্রেটিস বলে ছিলেন, ‘An unexamined life is not worth living.’- অর্থাৎ, একটি পরীক্ষাহীন জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।
সক্রেটিসের এই বাণী একজন বিতার্কিকেরও বিশ্বাস। অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিতর্ক শৈল্পিক প্রতিবাদ। কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে মুক্তবুদ্ধি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সেই মুক্তবুদ্ধির অনিবার্য অনুষঙ্গ বিতর্ক।
সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা কীভাবে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে এর উদাহরণ আমাদের দেশে সহ গোটা বহির্বিশ্বে রয়েছে। ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে এদেশে। যেসব তরুণ বিভ্রান্ত হয়ে এসব আত্মঘাতী দুষ্কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করেছিল তারা আকৃষ্ট হয়েছিল ধর্মের কট্টরতা এবং পশ্চাৎপদতার সংস্কৃতির আমদানির জন্যে ধর্মের অপব্যাখ্যা দ্বারা। বাস্তবতা, সত্য এবং যুক্তির আলোয় আলোকিত কোনো তরুণের পক্ষে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হওয়া কখনোই কোন ভাবেই সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ নির্মূলের লক্ষে আমাদের সমাজে সর্বস্তরে ভিন্ন মত সহ নানা মতের হরেক রকমের জ্ঞানের বই পড়তে মানুষকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। নানা মতের বই পড়া মানুষকে সহিষ্ণু করে তুলে। মানুষকে ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরিতে নিসন্ধেহে বই প্রেম কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারে ।
ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি জীবন দিতে পারি।’ বিতর্কের মূল চেতনাই এই উক্তিতে ফুটে উঠেছে। শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও যুক্তির অনুশীলন অপরিহার্য। এক্ষেত্রে যুক্তিবর্জিত হলে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখা দেয় তার উদাহরণ বিশ্বময় ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল হিটলারের অযৌক্তিক ও একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে। পৃথিবীতে যত যুদ্ধ বিগ্রহ দেখা দিয়েছে তার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে সেখানে ছিল কোনো পক্ষের যুক্তিবর্জিত চিন্তাধারা ও যুক্তিহীননভাবে পেশিশক্তির প্রদর্শনের চরম প্রবণতা। যুদ্ধের বদলে যখন শান্তির আশা ব্যক্ত হয়, রণাঙ্গনের বদলে যখন কূটনীতির টেবিলে সমস্যার সমাধান হয়, তখন যুক্তিরই জয় হয়।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটি স্মরণ করা যাক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনীহাই সংঘর্ষের বীজ বপন করেছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে সেটাই হতো যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক আচরণ। কিন্তু তা না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বর্বরের মতো বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। তাদের এই নৃশংসতাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে এদেশের মানুষকে। এরই পরিণতিতে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র এই বাংলাদেশের জন্ম। বলা যায় ইতিহাসের যৌক্তিক পরিণতিতেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। তাই এদেশে একটি যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা খুব তীব্র। এ তীব্রতাকেই ধারণ করছে এখনকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বিতার্কিকরা। যা মাঝে মধ্যে টেলিভিশনের টক শো গুলিতে দেখা যায়, এর তিব্রতা আর বেগবান করতে হবে।
মুক্তচিন্তা, বিতর্ক ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রই হচ্ছে পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীল আচরণ। বিতর্ক আমাদের এই অনুশীলনই করায়। পছন্দ হোক বা না হোক, প্রতিপক্ষের বক্তব্য একজন বিতার্কিককে মন দিয়ে শুনতে হয়। এরপর নিজের অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তার বক্তব্য অধিকতর যৌক্তিক, তবে তিনি বিজয়ী। অর্থাৎ পেশিশক্তি নয়, যুক্তির শক্তি দিয়ে এখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে। জোরের যুক্তি নয়, যুক্তির জোর এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে। এটিই গণতান্ত্রিক চেতনা। তাই প্রত্যেক বিতার্কিক একজন ক্ষুদে রেনেসাঁ মানব। মানব সভ্যতার আলোকায়নের যে সুদীর্ঘ যাত্রা, সেই যাত্রায় আজ নেতৃত্ব দিতে হবে বিতার্কিককে। আমরা প্রায়ই শুনি শক্তিশালী গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদের গুরুত্বের কথা। যুক্তিস্নাত সেই রাঙ্গা প্রভাতটি বিতার্কিকরাই এনে দিতে পারেন।

