ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়, প্রশ্ন মানেই অবমাননা নয়। মানুষ জন্মগতভাবে চিন্তাশীল। আমরা সকলেই জানতে চাই, বুঝতে চাই, ভাবতে চাই। আমরা কেবল মুখস্থ করে চলার জন্য জন্মাইনি। আমরা প্রশ্ন করি, দ্বিমত পোষণ করি, কারণ আমরা জ্ঞান অর্জন করতে চাই। আর এই জানার পথের প্রথম ধাপই হলো প্রশ্ন করা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চা করা ।
মত প্রকাশের অধিকার মানে ধর্ম অবমাননা নয়। আজকাল আমাদের দেশে একটা ভয়ংকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে কেউ ধর্ম, সমাজ, বা সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুললেই আমরা তাকে ‘ধর্ম অবমাননা’, ‘অবিশ্বাসী’ বা নাস্তিক বলি। যেন ভিন্নভাবে ভাবার অধিকার কারও নেই! অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক মানবাধিকার, ঠিক খাবার, পানি বা আশ্রয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ যদি শান্তভাবে, অশ্লীলতা ছাড়া, যুক্তির মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করে, তাহলে সেটা অপরাধ নয়। সেটা তার অধিকার। কেউ যদি ধর্মের কোনো প্রথা বা রীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাকে কি মারতে হবে? গালাগাল দিতে হবে? সমাজ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে?
আপনার ধর্ম যদি সত্য হয়, যদি তা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আসে, তাহলে সে ধর্ম আলোচনার মুখোমুখি হতে ভয় পাবে কেন? বরং যে ধর্ম আলোচনায় টিকে থাকে, প্রশ্নের উত্তরে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করে, সেটিই প্রকৃত ধর্ম।
আজ অনেকে বলেন, “এই কথাটা আমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে।” প্রশ্ন হলো, আপনি কি নিশ্চিত যে সে কথাটা সত্যিই ঘৃণা ছড়ানোর জন্য বলা হয়েছিল, নাকি সেটা একটি জানার চেষ্টা ছিল? অনেক সময় আমরা ভিন্নমতের শব্দ শুনেই রেগে যাই, কিন্তু বুঝি না সে মানুষটি হয়তো শুধু জানতে চাইছে, কারণ সে সত্যকে ভালোবাসে।
উদাহরণ: ধর্মীয় অনুভূতি বনাম যুক্তিমূলক প্রশ্ন
এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সে ক্লাসে বলেছিল, “আমরা অনেক রীতিনীতির কথা শুনি ধর্ম থেকে, কিন্তু এর কিছু অংশ কি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনশীল নয়?” সে প্রশ্ন তুলেছিল: “নারীদের প্রতি কিছু আচরণ কি আসলেই ধর্ম নির্দেশিত, না কি অন্য কোন দেশের সংস্কৃতি থেকে এসেছে?”
এই প্রশ্ন শুনে কিছু সহপাঠী তাকে ‘নাস্তিক’, ‘ধর্মদ্রোহী’ বলে তিরস্কার করে, মারদধর করে এবং সামাজিকভাবে বয়কট করে। অথচ সে কাউকে গালি দেয়নি, ধর্মকে অবমাননা করেনি । সে শুধু জানতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। এভাবেই আমাদের সমাজে প্রশ্ন করাকে অপরাধ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।
প্রশ্ন করা কোনো অপরাধ নয়। বরং প্রশ্ন না করলে জ্ঞান জন্মায় না, সত্য ধরা দেয় না। প্রশ্নই আমাদের সভ্যতা, বিজ্ঞান, দর্শন, এবং মানবিকতা গড়ে তুলেছে।
এর ঐতিহাসিক উদাহরণ:
- গ্যালিলিও গ্যালিলি বলেছিলেন, “পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।” তখনকার ধর্মীয় নেতারা বলেছিলেন—এই কথা ঈশ্বরবিরোধী। তাঁকে জেলে পোরা হয়। কিন্তু আজ আমরা সবাই জানি, গ্যালিলিও ঠিকই বলেছিলেন।
- গৌতম বুদ্ধ সমাজে জাতিভেদ, কুসংস্কার ও অন্ধ আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তখনকার ব্রাহ্মণরা তাকে পরিত্যাগ করে। অথচ তাঁর ভাবনা এক নতুন আলোর পথ দেখায়।
- হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার মূর্তিপূজা, নারীর প্রতি অবিচার ও সমাজের অন্যায় রীতিনীতির বিরুদ্ধে বলেছিলেন। তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল, হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। অথচ তিনিই তখনকার সমাজে ন্যায়বিচার, শ্ৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রশ্ন করলেই কি ধর্ম দুর্বল হয়, ভেঙ্গে পরে?
অনেকে বলেন, “প্রশ্ন করলে ধর্মের ক্ষতি হয়।” কিন্তু এটা ভুল ধারণা। যে ধর্ম প্রশ্নে ভেঙে পড়ে, সে ধর্ম মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে পারে না। যে ধর্ম সঠিক পথ দেখাতে পারেনা, সেটা মানুষের প্রয়োজনেও আসেনা । প্রকৃত ধর্ম প্রশ্নের মুখে টিকে থাকে, আরও শক্তিশালী হয় এবং মানুষকে সঠিক পথ দেখায় ।
যেমন একজন শিক্ষক যদি ছাত্রের প্রশ্ন শুনে রেগে যান, তাহলে তিনি শিক্ষকের উপযুক্ত নন। তেমনি ধর্ম যদি প্রশ্ন শুনেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা আত্মবিশ্বাসহীনতার লক্ষণ।
আমাদের সমাজে যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, যদি কেউ প্রশ্ন করলেই তাকে শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে আমরা অন্ধকারেই পড়ে থাকব। সেই সমাজে জ্ঞান জন্মাবে না, যুক্তি টিকবে না, এবং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে একটি অসুস্ত, অমানবিক ও ভয়ঙ্কর শাসন ও রাষ্ট্র ব্যবস্তার ভিতর দিয়ে আমাদের বাচঁতে হবে ।
আমরা যদি সত্যের অনুসারী হই, তাহলে আমাদের যুক্তির শক্তিতে বিশ্বাস রাখতে হবে, আলোচনায় অংশ নিতে হবে। এবং মত প্রকাশ ও ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব, যদি আমরা সংবেদনশীলতা আর যুক্তিকে একসাথে মূল্য দিই।

