মানব জাতির ইতিহাস আসলে মানুষের ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে ওঠার গল্প। এটি কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, বরং অসংখ্য দিনের সংগ্রাম, ভুল, শিক্ষা আর অভিজ্ঞতার ফল। এই ইতিহাসে মানুষের দুঃখ দুর্দশার কান্না আছে, স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, আবার সাহসও আছে। মানুষ যেমন প্রকৃতির কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে, তেমনি নিজের বুদ্ধি ও চেষ্টায় সে প্রকৃতির অনেক রহস্য উন্মোচন করতেও সক্ষম হয়েছে। মানব ইতিহাস তাই কেবলই একটি অতীতের কাহিনি নয়; এটি মানুষের পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক দলিল।আদিম যুগে মানুষ ছিল প্রকৃতির এক অসহায় প্রাণী। খাদ্যের সন্ধানে তাকে ঘুরে বেড়াতে হতো, রাত কাটাতে হতো গুহায় কিংবা খোলা আকাশের নিচে। বন্য পশু, ঝড়-বৃষ্টি ও অজানা রোগ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। জীবন তখন ছিল খুব ছোট এবং খুবই অনিশ্চিত, প্রতিদিনিই মানুষকে অন্য কোনো প্রাণী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রান নাশের ভয়ে মানুষকে দিনরাত্রি পার করতে হতো। তবু এই কঠিন সময়েই মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় ভাবনার বীজ। আগুনের ব্যবহার তাকে উষ্ণতা ও নিরাপত্তা দেয়, পাথরের হাতিয়ার তাকে শক্তি জোগায়, আর গুহার দেয়ালে আঁকা ছবি, তার অনুভূতি প্রকাশের প্রথম ভাষা হয়ে ওঠে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি যেদিন থেকেই ব্যবহার করতে শুরু করে সেদিন থেকেই মানুষ আলাদা হতে শুরু করে অন্য সব প্রাণী থেকে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝতে শেখে, শুধু শিকার করে বেঁচে থাকলে ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়, এইযে “ভবিষ্যত” এই কথাটা নিয়ে ভাবনা, এই ভাবনায় মানুষের উন্নয়নের পথ তৈরি করেছিল। আগুন, পাথরের তৈরি হাতিয়ারের ব্যাবহারের পরে কৃষির আবিষ্কার মানব জীবনে এক বড় পরিবর্তন আনে। মানুষ যখন মাটি চাষ করে ফসল ফলাতে শেখে, তখন তার জীবনে স্থায়িত্ব আসে। নদীর ধারে ধারে গড়ে ওঠে বসতি, জন্ম নেয় গ্রাম। পরিবার ও সমাজের বন্ধন শক্ত হয়। মানুষ তার পর থেকে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও ভাবতে শেখে। এই সময়েই নিয়ম, আচার এবং নৈতিকতার ধারণা গড়ে ওঠে, যা সমাজকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।এই সামাজিক জীবনের পরিণত রূপ দেখা যায় প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে। মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে মানুষ প্রথম লেখার মাধ্যমে নিজের কথা ভবিষ্যতের জন্য রেখে যায়। সেখানের আইন ও শাসনব্যবস্থা সমাজকে শৃঙ্খলিত করে। প্রাচীন মিশর-এ মানুষ জীবন ও মৃত্যুকে গভীরভাবে ভাবতে শেখে, যার প্রমাণ আজও পিরামিডে দেখা যায়। আবার সিন্ধু সভ্যতা দেখিয়ে দেয় পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্নতা আর নিয়ম মেনে চলাও সভ্যতার বড় চিহ্ন। এসব সভ্যতা মানুষকে শিখিয়েছে একসঙ্গে থাকাই টিকে থাকার সেরা উপায়।কালের নিয়মে সভ্যতাগুলো ভেঙেছে, নতুন সভ্যতা গড়ে উঠেছে। মধ্যযুগে মানুষের জীবনে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাব বেড়ে যায়। রাজা ও শাসকের সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের ভাগ্য। অনেক সময় মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়েছিল তাদের কারণে। তবু মানুষের মন কখনো পুরোপুরি নীরব হয়নি। গল্প, গান আর চিন্তার ভেতর দিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।এরপর আসে নতুন চিন্তার সময়। মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, যুক্তির গুরুত্ব বুঝতে শিখে। ধীরে ধীরে সে নিজেকে স্বাধীনভাবে ভাবতে শুরু করে। তারপরে শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনে মানুষের অনুভূতি প্রকাশ পায় আরও স্পষ্টভাবে। মানুষ বুঝতে পারে যে সে শুধু নিয়ম মানার যন্ত্র নয়, কারো গোলাম নয়, সে চিন্তা করতে পারে, ভালোবাসতে পারে, পরিবর্তন আনতে পারে।তারপরে শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনে গতি আনে। মানুষের আবিষ্কার করা যন্ত্র মানুষের কাজ সহজ করে দেয়, তারপর আস্তে আস্তে শহর বড় হতে থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমস্যা দেখা দেয়, যেমন বৈষম্য, শ্রমিকের কষ্ট, প্রকৃতির ক্ষতি ইত্যাদি। মানুষ তখন থেকে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে , উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরো কিছু দায়িত্বও জরুরি। আজকের আধুনিক যুগে মানুষ অনেক দূর এগিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। তবু মানুষের সামনে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে যে এই অগ্রগতি কি মানুষকে আরও মানবিক করেছে, টিকিয়ে রাখা ভূমিকা পালন করছে, নাকি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? মানব জাতির ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রকৃত উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন জ্ঞানের সঙ্গে মানবিকতা যুক্ত হয়।এবং মিলেমিশে একত্রিত হয়ে থাকায় টিকে থাকার মূলমন্ত্র। ইতিহাস তাই আমাদেরকে শুধুই অতীতের কথা বলে না, আমাদের কেমন হওয়া উচিত, কি করা উচিত, কি করা উচিৎ না, সেইসব কথাও মনে করিয়ে দেয়।আজকে এইযে প্রযুক্তির বিপ্লব এবং অপব্যবহার এবং একইসাথে অতি ব্যবহার এই সবই আমাদেরকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাড় করাচ্ছে। সমুদ্রের পাড়ে একটি শিশুর খেলনার ছলে দীর্ঘ সময় ধরে বালি দিয়ে তৈরি করা কোনো কাঠামো কিংবা ঘর যেমন সামান্য একটু আগাতেই পুরুপুরি ভেঙে পড়তে পারে, আমাদের মানব সভ্যতাও অতি আধুনিকতা ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
Thursday, January 15
Trending
- প্রকাশিত হলো ভন্ডামি ও কুযুক্তির মুখোশ উন্মোচনের বই, সত্যের মুখোমুখি !
- মানব জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
- স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস এবং এর বাস্তবতা
- জামাত শিবিরের বট বাহিনীর সংঘবদ্ধ রিপোর্টের কারণে আমার ফেসবুক প্রোফাইলটি ডিজেবল হয়ে গিয়েছে
- জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও চরিত্র : একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী –
- নাস্তিকতা – বিশ্বাসের বাইরে এক চিন্তার জগৎ
- ওয়াজের নামে ধর্ম ব্যবসা
- ধর্ম ও বাংলাদেশের রাজনীতি

