আজকাল বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে, টিভিতে পত্রিকায় সোস্যাল মিডিয়ায় সবজায়গাতেই ইন্টেলেকচুয়াল মানুষদের মধ্যে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে কিউরিসিটি বাড়ছে, ব্যাপারটা খুবই স্বস্তিদায়ক। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, খুব কম ক্ষেত্রেই বিষয়টিকে গভীরভাবে এবং সততার সাথে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজে বাকস্বাধীনতার অর্থ হলো মানুষ এমন কথাও বলতে পারবে যা অন্যদের কাছে অস্বস্তিকর, অপ্রিয় বা অসম্মতিপূর্ণ হতে পারে। এই অস্বস্তি আসলে মুক্ত চিন্তার পরিবেশেরই একটি স্বাভাবিক অংশ, এখানে প্রকৃত বাকস্বাধীনতা মানে হচ্ছে, “আপনি যা শুনতে চান না, আমার তাই বলার অধিকার থাকা।” কিন্তু এটি কি আদো এদেশে সম্ভব?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা শুরু হয় যখন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ইসলাম ধর্ম। আমাদের সমাজে ধর্ম অনেক মানুষের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে যে কোনো ধারণা, প্রথা বা প্রতিষ্ঠান এমনকি ধর্মসহ, কোনোটিই আলোচনা বা সমালোচনা এবং বিশ্লেষণের বাইরে থাকতে পারে না। যখন কিছু বিষয় সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নের বাইরে চলে যায়, তখন চিন্তার স্বাধীনতার অবস্থা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে মূলত এখানেই মূল দ্বন্দ্বটি তৈরি হয়। একদিকে অনেক মানুষ তাদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করেন, অন্যদিকে লেখক, চিন্তাবিদ এবং নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করেন যে সমাজের অগ্রগতির জন্য দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা থাকা জরুরি।
একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী সমাজের কাজ হলো এই দুই বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা, মানুষের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রাখা, কিন্তু একই সঙ্গে ধারণা ও মতামতকে খোলা আলোচনার সুযোগ দেওয়া। বাকস্বাধীনতার অর্থ মানুষকে আক্রমণ করা না বরং মানুষের মনে চিন্তায় জন্ম নেওয়া নতুন নতুন ধারণাগুলোকে যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়া। সেই সুযোগটা আমাদের ধর্মীয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ করে।
আমাদের দেশ যদি সত্যিকারের একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে বাকস্বাধীনতা নিয়ে আলোচনাকে আরও পরিণত, সহনশীল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক করতে হবে। একটি আত্মবিশ্বাসী সমাজ কোন প্রকার বিতর্ককেই ভয় পায় না; বরং বিশ্বাস করে যে খোলামেলা আলোচনা শেষ পর্যন্ত সমাজকে আরও সচেতন, মানবিক এবং প্রগতিশীল করে তোলে।
অতএব, আমাদের এটিই শ্রেষ্ঠ সময় একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার, যেখানে মতাদর্শের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবার উপরে স্থান পাবে বাকস্বাধীনতা।
© সাদেক মাহমুদ

