(মরুভূমি ও সমুদ্রের সংলাপ)
মরুভূমি:মানবজীবনের প্রকৃত গভীরতা বোঝা কি এত সহজ, সমুদ্র? সবকিছু তো চোখে দেখা যায় না তবুও মানুষ অনুভব করে যে কোথাও যেন এক অন্তরদৃষ্টি কাজ করে। আমার মনে হয়, এই বিশাল মহাবিশ্বে যারা অস্তিত্ব লাভ করেছে, তারা সবাই এক অনন্ত পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশমাত্র।
সমুদ্র:তুমি কি বলতে চাও যে, এই বিশালতা কোনো একজন সৃষ্টি কর্তার ইশারায় নয়?
মরুভূমি:অনেকটা তাই। যেমন মানবদেহে কোটি কোটি কোষ একত্রে মিলিত হয়ে একটি জটিল জৈব কাঠামো তৈরি করে, তেমনি এই মহাবিশ্বও অসংখ্য জটিল উপাদানের সম্মিলনে গঠিত। আমি মনে করি, এর পেছনে আছে এক বা একাধিক মহাজাগতিক পরিকল্পক যাকে আমরা এখনো চিনিনা এবং, যা মানুষের বোধের সীমার বাইরে।
সমুদ্র:কিন্তু মানুষ তো নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী মনে করে।
মরুভূমি:আমার দৃষ্টিতে, মানুষ এই মহাবিশ্বের তুলনায় ঠিক যেন মানুষেরই শরীরে থাকা একটি ব্যাকটেরিয়ার মতো যে জানে না সে কার অংশ, বা তার উপস্থিতি কতটা মূল্যবান। তেমনি মানুষও জানে না কেন তার অস্তিত্ব, কে তাকে সৃষ্টি করেছে, কিংবা এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায়।
সমুদ্র: তাহলে মানুষ কীভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাসে পৌঁছায়?
মরুভূমি: প্রশ্ন করতে করতেই। আমি উপলব্ধি করছি যে মানুষের যুক্তি আর জ্ঞানের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই বিশ্বাসের শুরু।
সমুদ্র:তাহলে কি তুমি বলতে চাইছো যে, চারপাশে যা ঘটে সবই কোনো মহা পরিকল্পনার অংশ?
মরুভূমি: আমার তাই মনে হয়। প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি সৃষ্টি এমনকি একটি ক্ষুদ্র পাখির ডানার গঠনও, সবই যেন এক অসাধারণ পরিকল্পনার ফসল। পৃথিবীর কক্ষপথ, সূর্যের নির্দিষ্ট দূরত্ব, ঋতুচক্র, গাছের পাতায় সালোকসংশ্লেষণ, এসবের পেছনে যে নির্ভুল গণিত, ম্যাকানিজম ও শৃঙ্খলা আছে, তা কেবল আকস্মিক হতে পারে না।
সমুদ্র:তবে যদি ধরি যে, কোনো এক স্রষ্টা ই সবকিছু তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাহলে কি আমাদেরকে সেই স্রষ্টাকে কেবল ধর্মগ্রন্থেই খুঁজতে হবে, নাকি অন্য কোথাও?
মরুভূমি:আমি মনে করি, স্রষ্টাকে খুঁজতে হয় প্রকৃতির রূপে, বিজ্ঞানের অমীমাংসিত প্রশ্নে, মানুষের আত্মবোধে। তিনি এমন এক মহাশক্তি, যাঁকে পুরোপুরি বোঝা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, যেমন একটি পিঁপড়ে কখনো মহাকাশযানের জটিলতা বুঝতে পারে না।সমুদ্র:কিন্তু অনেকে তো বলে, “দেখিনি, তাই বিশ্বাস করি না।”
মরুভূমি:মানুষ কি সত্যিই সবকিছু চোখে দেখে বিশ্বাস করে? ভালোবাসা, আশা, চিন্তা; এসব কি দেখা যায়? তবু তো মানুষ অনুভব করে। স্রষ্টার উপস্থিতিও তেমনই, দেখা যায় না, কিন্তু অনুভূত হয়।
সমুদ্র:কখন সেই অনুভূতি সবচেয়ে গভীর হয়?
মরুভূমি:গোধূলির আকাশে রঙের খেলায়, শিশুর নিষ্পাপ হাসিতে, কিংবা অরণ্যে একাকী দাঁড়ানো একটি বৃক্ষের সামনে। তখন মনে হয়, এসব কিছু যেন কোনো মহাজাগতিক সত্তা নিপুণ হাতে ডিজাইন করে সাজিয়েছেন।
সমুদ্র:এই বিশ্বাস কি অন্ধ আনুগত্য নয়?
মরুভূমি:না। আমি বিজ্ঞানের মূল্য বুঝি, যুক্তিকে সম্মান করি। কিন্তু এটাও জানি যে, যুক্তিরও সীমা আছে। “বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল?”, “চেতনার উৎস কোথায়?”, “সর্বজগতের উদ্দেশ্য কী?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানের হাতে নেই। এমতাবস্থায় বিশ্বাসই এক সহায়ক আলোর মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। সমুদ্র:তাহলে এই বিশ্বাস মানুষকে কী দেয়?
মরুভূমি:আমার মতে, এই বিশ্বাস মানুষকে সংযত করে, নীতি-নৈতিকতা শেখায়, সহানুভূতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি কেবল ধর্মীয় অনুভূতি নয়, এটি এক অস্তিত্বের দিকদর্শন।
সমুদ্র:পরিশেষে মানুষ কী উপলব্ধি করে?
মরুভূমি:এই যে মানুষের কোনো কিছুর বিশ্বাস করার ব্যাপারটা, এটি কেবলই মনের প্রশান্তি নয়, এটি এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি। মানুষ কিন্তু সবকিছু চোখে দেখতে পারে না, যেমন তোমার সামনের এই শূন্য ফাঁকা জায়গায় নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প, নিয়ন, হিলিয়াম, মিথেন ইত্যাদি রয়েছে, কিন্তু তুমি আমি সেটা দেখতে পারছি না। কিন্তু দেখতে পারছিনা বলেই যে নেই এমনটা ত নয়।এইসব আছে এবং আমরা এইসব যে আছে সেটা নিজের চোখে না দেখেও বিশ্বাস করি অন্য কোনো একটা থার্ড পার্টি সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যের উপর ভরসা করে। ঠিক একই ভাবে আমাদের স্রষ্টাকে আমরা দেখতে পাইনা। তবে এখানে আমরা কোনো থার্ডপার্টি সোর্সকেও বিশ্বাস করতে পারি না, কারণ পৃথিবীর ৪০০০ এর অধিক ধর্ম ও মত এই স্রষ্টার ধারণা হাজার ভাবে হাজার ধারণায় ব্যাখ্যা করে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে, ফলে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা সেইটা আমাদের যাচায় করে কোনোটার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের সম্ভব হয়ে উঠছে না। তবে এর মানে এও কিন্তু নয় যে এই মহাবিশ্বের কোনো গ্র্যান্ড ডিজাইনার বা মহাজাগতিক স্রষ্টা থাকতে পারে না, বরং আমরা তাকে দেখার বা উপলব্ধি করার সক্ষমতা রাখিনা, যেমন করে একটি ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরের ভিতরে থেকে জীবন যাপন করলেও আমাদের শরীর কতটা বড় এবং বিস্তৃত কিংবা সে কার শরীরে রয়েছে সেটা সে উপলব্ধি করার সক্ষমতা রাখে না। সুতরাং এখানে চোখের দেখায় শেষ নয়, আমাদের অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে সেটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে হবে। আর এই উপলব্ধি করার চেষ্টা মানুষকে মহাজাগতিক এক স্রষ্টার সামনে নতজানু করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ আসলে এক মহাপরিকল্পনার ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র।

