সমকামীদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক মূলত অধিকার আছে কি না, সেই প্রশ্নকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্র নাগরিকত্বকে শর্তসাপেক্ষ করবে কি না, সেই মৌলিক রাষ্ট্রবোধের প্রশ্নকে সামনে আনে। আধুনিক রাষ্ট্রে অধিকার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত। যৌন পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা জীবনধারার কারণে কোনো নাগরিকের অধিকার বাতিল হয় না। অধিকার কোনো অনুমোদননির্ভর সুবিধা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বয়ানে এমন ভাষা ক্রমাগত ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে সমকামী মানুষকে “থাকার অযোগ্য” বা “দেশছাড়া করার যোগ্য” হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই বক্তব্যগুলোকে প্রায়ই মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলো নাগরিকত্ব হরণ ও সহিংসতার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ডিহিউম্যানাইজেশনের একটি ক্লাসিক উদাহরণ—যেখানে একটি গোষ্ঠীকে নাগরিক সমাজের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্র নাগরিককে চিহ্নিত করে জন্ম, আইনি পরিচয় এবং আইনের সামনে সমতার নীতির ভিত্তিতে। নাগরিকত্ব কোনো নৈতিক শুদ্ধতা পরীক্ষার বিষয় নয়। যদি যৌন পরিচয়ের কারণে অধিকার বাতিল করা যায়, তবে একই যুক্তিতে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মতাদর্শ বা ভিন্ন জীবনযাপনও অপরাধে পরিণত হতে পারে। এভাবে অধিকারকে শর্তসাপেক্ষ করা হলে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা বা সাংস্কৃতিক স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। মানবাধিকার সেই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে অর্থবহ, যেখানে তা সংখ্যাগরিষ্ঠের অপছন্দ সত্ত্বেও সংরক্ষিত থাকে। অধিকার জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে নির্ধারিত হলে রাষ্ট্র আর ন্যায়বিচারের কাঠামো থাকে না; তা কেবল সংখ্যার শাসনে পরিণত হয়।
সমকামী মানুষ সমাজের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। তারা একই সমাজে জন্মগ্রহণ করে, একই ভাষায় কথা বলে, একই অর্থনৈতিক কাঠামোতে শ্রম দেয় এবং একই সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে জীবন যাপন করে। তাদের অস্বীকার করার অর্থ হলো সমাজেরই একটি অংশকে অদৃশ্য করা, যা কোনো সমাজকে শক্তিশালী করে না বরং সামাজিক ভাঙন ত্বরান্বিত করে।
ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, রাষ্ট্রের নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের সামনে সমতা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা অন্য নাগরিকের অধিকার বাতিল করার লাইসেন্স নয়। রাষ্ট্র যখন এই সীমারেখা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন নীরবতাই অধিকার লঙ্ঘনের সহযোদ্ধায় পরিণত হয়।
নাগরিক নিরাপত্তা ছাড়া অধিকার কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে। যখন কোনো গোষ্ঠীকে বলা হয় যে তাদের “থাকার অধিকার নেই”, তখন তাদের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। এর ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অধিকারগুলো বাস্তব অর্থ হারায়। ফলে এই বিষয়টি কেবল নৈতিক বা তাত্ত্বিক নয়; এটি সরাসরি জীবন ও রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন।
সমকামীদের অধিকার থাকার কারণ একটাই—তারা মানুষ। মানুষ হওয়াই অধিকার পাওয়ার একমাত্র শর্ত। যে রাষ্ট্র কিছু মানুষকে “কম মানুষ” হিসেবে চিহ্নিত করে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সকল নাগরিকের অধিকারকেই দুর্বল করে দেয়।

