বাংলাদেশসহ উপমহাদেশীয় সমাজব্যবস্থায় নারীকে এখনও একটি পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়, বরং পুরুষের অধীনস্থ ঘৃহিণী, কখনো ভোগ্যপণ্য কিংবা ঘরের কাজের লোক হিসেবেই অধিকাংশ সময় বিবেচনা করা হয়। যদিও সমাজে নারীর অবস্থান আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে, তথাপি সমাজের গভীরে এখনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা প্রবলভাবে বিদ্যমান। এই মানসিকতা নারীকে পুরুষের তুলনায় সবসময় নিচে রাখে, সীমাবদ্ধ করে তার চলাফেরা, চিন্তা ও সুযোগের পরিধিকে।
আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো মনে করা হয়—নারীর প্রধান কাজ হলো ঘরের কাজ করা, স্বামী-সন্তানের দেখাশোনা করা, এবং পরিবারের সেবায় নিয়োজিত থাকা। যদিও নারী আজ চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, পুলিশ, সৈনিক, রাজনীতিবিদ এমনকি মহাকাশচারীও হচ্ছে, তবুও সমাজের এক বড় অংশ মনে করে—এসব পুরুষের কাজ, নারীর উপযোগী নয়। এর ফলে বহু মেয়ে নিজের মেধা ও স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সমাজের চাপেই একপেশে জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়।
পিতার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এখনো অর্ধেক—এই আইনই প্রমাণ করে সমাজ নারীর মূল্য কতটা কম মনে করে। জন্মের সময় থেকেই একজন মেয়ে শিশুকে শিখিয়ে দেওয়া হয় যে সে ছেলে নয়, তাই তার সীমাবদ্ধতা আছে। খেলাধুলা, উচ্চশিক্ষা, ভ্রমণ, এমনকি নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।
শুধু পারিবারিক বা আর্থিক নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও নারীকে প্রায়শই ছোট করে দেখা হয়। রাস্তাঘাটে নারীর চলাফেরাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তার পোশাক নিয়ে চলে সমালোচনা, হয়রানি। কর্মক্ষেত্রে নারীকে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বারবার লড়তে হয়, যেখানে পুরুষ শুধুমাত্র পুরুষ হওয়াটাই একটি সুবিধা হিসেবে ভোগ করে। অনেক সময় নারীর অর্জনকেও ছোট করে দেখা হয় অথবা বলা হয়—সে “নারী হয়েও” এমন কিছু করেছে, যেন নারী মানেই দুর্বল বা অযোগ্য।
তবে আশার কথা, এই সমাজেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। নারীরা এখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন, উচ্চশিক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, উদ্যোক্তা হচ্ছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, আন্দোলন ও আইনী সুরক্ষার কারণে নারী আজ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন। কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার।
নারী সমাজের অর্ধেক অংশ—তাঁর প্রতি অবহেলা মানে সমাজের অর্ধেক শক্তিকে অকার্যকর করে রাখা। কোনো সমাজ তখনই উন্নত হতে পারে, যখন নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান সুযোগ, মর্যাদা এবং অধিকার পাবে। সমাজের ভেতরকার পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব দূর করতে হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, কেবল নারী হিসেবে নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব হবে একটি সমতা ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে নারী হবে শক্তি, প্রেরণা ও অগ্রগতির প্রতীক।
নারীর অধিকার ও আমাদের সমাজে এর বাস্তবতা
নারী অধিকার নিয়ে আমাদের দেশে বহু বছর ধরে আলোচনা চলে আসছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। নারীকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পত্তির অধিকারসহ সব নাগরিক সুযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে অধিকার এবং মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অধিকারগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর? আমাদের সমাজ নারীকে এসব অধিকার দিতে সত্যিই প্রস্তুত কি?
নারীর অধিকার মানে কেবল আইনের কাগজে লেখা কয়েকটি ধারা নয়। এটি মানে নারীর নিজস্ব পরিচয়, মর্যাদা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার স্বীকৃতি। বাস্তবে দেখা যায়, আমাদের সমাজে এই অধিকারগুলো অনেক সময় কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। নারীরা এখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাগ্রস্ত, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে ভয় পায়, নিজের শরীর বা চিন্তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায় না।
একটি মেয়ে শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে তার বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ধাপে তাকে লড়াই করতে হয়। মেয়ের জন্ম অনেক পরিবারে এখনো অপছন্দের বিষয়। স্কুলে যেতে চাইলেও অনেক সময় তাকে সাহায্য করা হয় না, বরং সংসারের কাজে হাত লাগাতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে ওঠে ‘পরিবারের সম্মানের বোঝা’। তার চলাফেরা, পোশাক, ব্যবহার—সবকিছুর ওপর এক ধরনের অদৃশ্য নজরদারি চলে। সমাজ ঠিক করে দেয়, সে কোথায় যাবে, কাকে বিয়ে করবে, কীভাবে জীবনযাপন করবে।
অধিকার বলতে বোঝায় সমতা—কিন্তু বাস্তবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই এখনও বৈষম্যমূলক। একজন নারী যদি নিজের মত প্রকাশ করে, তখন তাকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত সাহসী’। যদি উচ্চশিক্ষা বা চাকরি করতে চায়, অনেকে প্রশ্ন তোলে—“চাকরি করে কী করবে?” আবার যদি ঘরে বসে থাকে, তাহলে সমাজ বলে, “কিছু করতে পারে না।” অর্থাৎ নারী যা-ই করুক, তাকে গ্রহণ করার মন-মানসিকতা আমাদের সমাজে এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
নারীর কর্মজীবনে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে—এই একটি দিককে দেখিয়ে অনেকে বলেন, “নারীর অধিকার অনেক বেড়েছে।” কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনও নারীরা বৈষম্যের শিকার হন। সমান মেধা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের গুরুত্ব কম, বেতনেও অনেক সময় পার্থক্য থাকে। আবার, অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, হুমকি বা চরিত্র নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ফলে কর্মজীবী নারীকে একদিকে পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে সমাজের কটাক্ষ—দুই দিক সামলাতে হয়।
নারীর অধিকার বাস্তবে কার্যকর করার সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মানসিকতা। অনেক পরিবারে আজও মেয়েকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, কারণ সমাজ ভাবে, “সে তো স্বামীর বাড়ি চলে যাবে।” অথচ নারীও একজন সন্তান, এবং তারও নিজের পরিবারে সমান অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের সমাজে এই ন্যায্য দাবিকে বহু সময় ‘অভদ্রতা’ বা ‘লোভ’ হিসেবে দেখা হয়।
এছাড়াও, নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বড় সমস্যা। বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, গৃহনির্যাতন, পণের জন্য নির্যাতন—এসব ঘটনা আজও প্রচুর হারে ঘটে চলেছে। আইন থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া ধীর, এবং সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অনেক নারী মামলা করতেই পারেন না। ফলে বাস্তবতা হলো—নারীকে তার অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়, এবং সেই লড়াই তাকে একাই লড়তে হয়।
তবে আশার কথা হলো, ধীরে ধীরে নারীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। আজ অনেক নারী শিক্ষিত হচ্ছে, নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলছে, প্রতিবাদ করছে, নেতৃত্ব দিচ্ছে। সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম ও নতুন প্রজন্ম নারীর অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে। তবুও এ লড়াই এখনও অসমাপ্ত, কারণ এখনো পুরো সমাজ নারীর সমান মর্যাদা দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়।

