জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় জামায়াতে ইসলামী হিন্দেরই শাখা সংগঠন। ১৯৪১ সালে লাহোরে মওলানা আবুল আলা মওদুদী দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় ভারতের প্রধান আলেম সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ ছিল স্পষ্টভাবে ব্রিটিশবিরোধী ও স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু মওদুদী জমিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশপন্থী অবস্থান নেন এবং আলাদা ভাবধারার ওপর ভিত্তি করে জামায়াতে ইসলামী গড়ে তোলেন।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জামায়াত ভারতের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়। মওদুদী মুসলিম লীগকে “কাফের দল” বলেছেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রকে “আহাম্মকের বেহেশত” হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা দলের আদর্শগত দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে। পাকিস্তান সৃষ্টি পর তিনি সেখানে গিয়ে ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানিবিরোধী দাঙ্গা উস্কে দেন, যাতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর এবং বিভিন্ন উগ্র কর্মকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানে জামায়াতকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতে সংগঠনটি ১৯৯২ সালে নিষিদ্ধ হয়।
বাংলাদেশে জামায়াত যে নাম ব্যবহার করে তা নিয়েও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ” নামটি নির্দেশ করে এটি বিদেশি মূল দলের শাখা, আর “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী” নামে নিবন্ধন চাইলে তা দেশীয় রাজনৈতিক দলের পরিচয় দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। নাম পরিবর্তনের এই প্রচেষ্টা মূলত রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ‘রাজাকার, আলবদর, আল শামস’ বাহিনী সংগঠিত করে। এসব বাহিনী গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল যা আন্তর্জাতিক, জাতীয় এবং একাধিক গবেষকের নথিতে প্রমাণিত। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ পাকিস্তানকে পরোক্ষ সমর্থন দেয়, যার সুযোগ জামায়াতও পায়।
দলটি ইসলামের রক্ষক দাবি করলেও প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর নিজের সন্তানরা জামায়াতে যোগ দেননি। তাঁর ছেলে পর্যন্ত প্রকাশ্যে জামায়াতকে “ধর্মের নামে ভণ্ডামির সংগঠন” বলেছেন। মওদুদীর বহু মত যেমন নবীকে ভুল-অযোগ্য মানুষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা মূলধারার ইসলামী আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণে অনেক গবেষক মনে করেন, জামায়াত ইসলামি আদর্শ নয়; বরং মওদুদীবাদ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শেই বেশি ভিত্তি করে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, সহিংস রাজনীতি এবং রাষ্ট্রবিরোধিতার অভিযোগে দলটির নিবন্ধন বাতিল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

