ধর্ম, বিশেষত ইসলাম, কোনোদিনই ব্যবসার মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল আত্মার মুক্তি, মানবতার শিক্ষা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি। অথচ বর্তমান সমাজে আমরা এক ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন—যেখানে ধর্মচর্চার অন্যতম মাধ্যম ওয়াজ ক্রমেই রূপ নিচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক শিল্পপণ্যে, যার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক লাভ, সামাজিক প্রভাব ও ডিজিটাল তারকাখ্যাতি। এমন পরিস্থিতি আমাদের কেবল ভাবায় না, বরং প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে—এই যে ওয়াজের নামে ধর্মব্যবসা, এটি কি কেবল কয়েকজন বক্তার অসাধুতা, নাকি আমাদের গোটা ধর্ম চর্চা ও ভাবনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?
প্রথমত, ধর্মব্যবসার মূল উৎপত্তি হয়েছে ধর্মচর্চাকে “দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রূপান্তর” করার মাধ্যমে। অর্থাৎ, যেখানে ধর্ম ছিল নিজেকে জানার পথ, সেখানে এখন ধর্ম একধরনের “আবেগজর্জিত প্রোডাক্ট”—যা শ্রোতাদের চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেটজাত হয়, পরিবেশন হয়, এবং বিক্রি হয়। একজন বক্তা ওয়াজ শুরু করার আগেই ভাবেন—“আমি কী বললে লোক হাসবে, কাঁদবে, ভাইরাল হবে?” সে তখন আর কোরআনের ভাষ্যকার নয়, বরং একপ্রকার আত্মপ্রচারক। এবং আমরা, শ্রোতারা, সেই ব্যবসার ভোক্তা।
এই চিন্তার রূপান্তর শুধু বক্তার নয়, শ্রোতার মনস্তত্ত্বেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। একজন শ্রোতা এখন ওয়াজে যান ‘আত্মশুদ্ধি’র জন্য নয়, বরং ‘মনোরঞ্জন’ বা ‘নাটকীয় উত্তেজনা’ পাওয়ার জন্য। তিনি খুঁজে বেড়ান, কে কাকে ‘কাউন্টার’ দিল, কোন হুজুর কী ‘ঝাড়’ দিলেন, কে কীভাবে ‘দুর্বল সম্প্রদায়ের’ বিরুদ্ধে তীব্র কথা বললেন। এই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে—ধর্ম নয়, আবেগ। সত্য নয়, বিনোদন।
এর পেছনে আছে একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল ব্যবসা মডেল। বক্তারা এখন নিজের ওয়াজ ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেন, ভিউয়ের ভিত্তিতে আয় করেন, স্পন্সর খুঁজে নেন, কভার ডিজাইন করেন, ভিডিও শিরোনামে লেখেন—“এই কথাটা হজম করতে পারবেন না!”, “মাঠ কাপিয়ে দিলেন”, “হাসতে হাসতে কাঁদিয়ে দিলেন!” ধর্মের বক্তব্য আর আল্লাহর বাণী এখানে কনটেন্ট মাত্র। ইসলাম এখানে ‘ব্র্যান্ড’, বক্তা ‘ইনফ্লুয়েন্সার’, ওয়াজ ‘ডিজিটাল মার্কেটিং’।
এই ভয়াবহ রূপান্তরের ফলে ওয়াজের বিষয়বস্তু নিয়েও একধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এখন অনেক বক্তা ধর্মের মূল ব্যাখ্যার চেয়ে ইতিহাস বিকৃতি, মতবাদ-বিদ্বেষ, নারী বিরোধী কথা, গালিগালাজ ও রাজনৈতিক বিষোদগার দিয়ে ওয়াজকে চর্চিত রাখেন। তারা জানেন, এসব বললে ‘ট্রেন্ডিং’ হবে। শ্রোতা ‘ধর্মীয় উত্তেজনায়’ মাতবে, ইউটিউবের অ্যালগোরিদম তাকে সামনে রাখবে। অথচ এর ফলে যা হারিয়ে যাচ্ছে তা হলো—ইসলামের মূল বার্তা, যুক্তিবোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ওয়াজকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভাজন ও গোষ্ঠীবাদকে বৈধতা দেওয়া। আজ ওয়াজের মঞ্চ থেকেই ঘোষণা আসে—“আমরা সঠিক, অন্যরা ভ্রান্ত”, “এই ফেরকা জাহান্নামী”, “অমুক বক্তা কাফের”। এমন কথা যখন হাজারো মানুষ উৎসাহ নিয়ে শোনে, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—এই বক্তারা কি ধর্ম শেখাচ্ছেন, নাকি ঘৃণা শেখাচ্ছেন? এইভাবে ওয়াজ সমাজে বিদ্বেষের জৈব সার হয়ে দাঁড়িয়েছে—যা মৌলিক ধর্মচর্চার সবচেয়ে বড় শত্রু।
সবচেয়ে গভীর সমস্যাটি হলো, ধর্মকে প্রশ্নহীন করে তোলা। আজকের ওয়াজ কালচারে শ্রোতারা যে কোনো বক্তার কথাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেয়। কেউ যাচাই করে না, খোঁজ করে না, ব্যাখ্যা বোঝে না। ফলে ধর্ম হয়ে উঠেছে একরকম ‘আবেগনির্ভর বিশ্বাস’, যেখানে যুক্তি, জিজ্ঞাসা, বা স্বতন্ত্র চিন্তা থাকার সুযোগ নেই। আর এটি ধর্মের মৌলিক আত্মাকে হত্যা করে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন আসে—দোষ কার? শুধু বক্তাদের? নাকি শ্রোতা, মিডিয়া, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাই এই ধর্মব্যবসার জৈব কাঠামো গড়ে তোলায় অংশীদার? বক্তা অর্থের লোভে ওয়াজকে ব্যবসায় পরিণত করেন, আয়োজক জনপ্রিয়তা ও ভিড়ের আশায় তাঁকে আমন্ত্রণ করেন, মিডিয়া দর্শকসংখ্যা বাড়াতে এসব চমকপ্রদ ওয়াজকে প্রমোট করে, এবং শ্রোতা নিজেই প্রভাবিত হন চিৎকার, নাটক আর আবেগময় নাট্যরূপ দেখে।
অতএব, সমালোচনার লক্ষ্য কেবল বক্তা নয়—আমাদের নিজেদের ধর্মচর্চার সংস্কৃতির দিকেই আঙুল তুলতে হবে। যদি আমরা সত্যিই ইসলামের আলো খুঁজে ফিরি, তবে আমাদের দরকার প্রশ্ন করা, যাচাই করা, চিন্তা করা, এবং অহংকার থেকে দূরে থাকা। ধর্মকে তার পবিত্র অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ওয়াজকে ‘বিনোদন’ নয়, আবারও ‘আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ’ হিসেবে ভাবতে শিখতে হবে।
ওয়াজ যদি ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং ব্যক্তিগত প্রচার ও ব্যবসার হাতিয়ার হয়, তাহলে সে আর ধর্মচর্চা থাকে না—সে হয়ে ওঠে ধর্মের নামে এক আত্মবিরোধী শো। এই ‘শো’-এর গ্ল্যামার যতই চোখধাঁধানো হোক না কেন, তা ইসলামের সৌন্দর্য ও সার্বজনীনতা থেকে মানুষকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। তাই ধর্মকে রক্ষা করতে হলে, ওয়াজের এই বাণিজ্যিক রূপের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে আমাদেরই।

